মূল্যস্ফীতি আবারো ৯ শতাংশ ছাড়াল

মূল্যস্ফীতি আবারো ৯ শতাংশ ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সবশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, এপ্রিলে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ; যা চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা মোকাবেলায় এপ্রিলের মাঝামাঝি দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা হয়। এতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ে ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত। এর প্রভাবে বাজারে প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামগ্রিক বৈশ্বিক ও স্থানীয় জ্বালানি পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে দেশের মূল্যস্ফীতিতে। তবে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা পূর্বাভাস দিয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করলে এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহে উন্নতি হলে সামনের অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ঘরে নেমে আসবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি উসকে দিতে ভূমিকা রেখেছে। জ্বালানি সংকটের ফলে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির কারণে বাজারে কমেছে খাদ্যপণ্যের সরবরাহ। অন্যদিকে নির্মাণসামগ্রী, ইলেকট্রনিক, অটোমোবাইলসসহ খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দামও বেড়েছে।

বিবিএসের তথ্যানুসারে, এপ্রিলে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ হয়েছে; যা মার্চে ছিল ৮ দশমিক ১৪ শতাংশ। এছাড়া খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ; যা মার্চে ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ঘরে থাকলেও ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ হয়। তবে বিবিএসের তথ্যে দেখা যায়, মার্চে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে নেমে এসেছিল। এর আগে জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং ডিসেম্বরে ছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। তবে গত বছরের এপ্রিলে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ।

জানতে চাইলে বিবিএসের ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং উইংয়ের পরিচালক মুহাম্মদ আতিকুল কবীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন এলাকার ১৫৪টি বাজার থেকে নিয়মিতভাবে তথ্য সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হয়। সেই তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতির হিসাব প্রকাশ হয়। আমরা বাজার থেকে পণ্যের দাম সংগ্রহ করে মূল্যসূচক নির্ধারণ করি। যেমনটা দেখেছি সেটিই প্রকাশ করি।’

মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গ্রাম ও শহরে পার্থক্য দেখা গেছে। বিবিএসের তথ্যানুসারে, এপ্রিলে গ্রামে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ ও শহরে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। একই সঙ্গে বেড়েছে শ্রমিকের মজুরির হারও। মার্চে মজুরির হার ছিল ৮ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ, যা এপ্রিলে বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ।

মূল্যস্ফীতি নিয়ে গতকাল ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘ইনফ্লেশন ডায়নামিকস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬) মূল্যস্ফীতি আগের প্রান্তিকের তুলনায় বেড়ে গড়ে প্রায় ৮ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে যা ছিল ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। তৃতীয় প্রান্তিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেড়েছে, যা মূলত শাকসবজি ও মসলার উচ্চ দামের ফলাফল। তবে খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে প্রোটিনভিত্তিক খাদ্যপণ্যই সর্বোচ্চ অবদান রেখেছে।

পরিসংখ্যান ও বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক বছর ধরেই দেশে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ, যা এর আগের ১৪ বছরের তুলনায় সর্বোচ্চ।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও ব্যর্থ হয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি-জুন সময়ের জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে, সেখানে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখার কথা জানানো হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, ‘মূল্যস্ফীতিকে শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে মোকাবেলা করা যথেষ্ট হবে না। সুদের হার ও ঋণপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, আমদানি ব্যবস্থাপনা, বিনিময় হার, জ্বালানি ব্যয়, বাজার তদারকিকে একসঙ্গে দেখতে হবে। বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, মজুদদারি ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, কৃষি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যবস্থার অদক্ষতা কমানো জরুরি। একই সঙ্গে গ্রামীণ ও শহুরে দরিদ্র, নিম্ন মধ্যবিত্ত, স্থির আয়ের মানুষ ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমজীবীদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা, স্বল্পমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, নগদ সহায়তা এবং কর্মসংস্থানভিত্তিক সহায়তা বাড়াতে হবে। মূল্যস্ফীতি শেষ পর্যন্ত শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি মানুষের খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও জীবনমানের ওপর সরাসরি আঘাত।’

দেশে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় খাতেই ব্যয়চাপ অব্যাহত থাকা। একই সময়ে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর আমদানি ব্যয় বেড়েছে, যা অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণ হচ্ছে।

এদিকে বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম গড়ে প্রায় ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। কমোডিটি মার্কেট আউটলুক বা পণ্যবাজার বিষয়ক পূর্বাভাস ২০২৬-এর এপ্রিল সংস্করণে বিশ্বব্যাংক বলেছে, জ্বালানির দামে ঊর্ধ্বগতির কারণে উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির (ইএমডিই) দেশগুলোর প্রবৃদ্ধিতে চাপ তৈরি হবে। এসব দেশের গড় মূল্যস্ফীতি চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে যেতে পারে। জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে জৈব জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে, যা ভোজ্যতেলের মতো পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

এদিকে জ্বালানি তেলের পর বিদ্যুতের দামও বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। এ সময় বিদ্যুতের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়বে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সূত্র জানিয়েছে, পিডিবি পাইকারি বিদ্যুতের দাম ১৭ শতাংশ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলেছে। দাম বাড়ানো হলে বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের দাম ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৪৮ পয়সা বাড়বে। এর আগে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সবশেষ বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছিল। তখন খুচরা পর্যায়ে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে ৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল বিদ্যুতের দাম।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মার্চ থেকে শুরু হওয়া জ্বালানি সংকটে তেল-গ্যাসের দাম বেড়েছে, সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত হয়েছে। ফলে সে প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে পড়েছে। সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েও মূল্যস্ফীতি কমাতে পারছে না। যুদ্ধের নতুন সংকট এটিকে আরো প্রকট করে তুলেছে। যেহেতু জ্বালানি আমাদের কৃষি, যোগাযোগ, উন্নয়ন, বিদ্যুৎসহ সবকিছুর সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই এটি অস্থির থাকলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে।’

বিদ্যুতের দাম বাড়ালে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়বে বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি মানে মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দেয়া। যার প্রভাব পড়বে নিম্নবিত্তদের ওপর। যারা এখন দারিদ্র্য থেকে বের হয়ে আসছে, তাদের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক এপ্রিল সংখ্যায় বলা হয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি দামের ঊর্ধ্বগতি এবং সরবরাহের চলমান বিঘ্নতার কারণে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বহিঃস্থ ধাক্কার প্রভাব কমে আসা এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতির ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এটি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকের এপ্রিল সংখ্যায় জানিয়েছে, চলমান মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে পূর্বাভাস সংশোধন করে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি সতর্ক করেছে, যদি জ্বালানির দামের ওপর চাপ অব্যাহত থাকে, তাহলে আরো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৬ শতাংশের বেশি হতে পারে।

আরও